আর্থিক প্রতিকূলতা, ভাড়া বাড়িতে জীবনযাপন আর পরপর দু’বার ব্যর্থতা—কোনও কিছুই দমিয়ে রাখতে পারেনি আদিবা আনামের স্বপ্নকে। তৃতীয় প্রচেষ্টায় UPSC পরীক্ষায় সর্বভারতীয় ১৪২তম স্থান অর্জন করে নিজের অধ্যবসায়ের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালানো বাবার মেয়ের এই সাফল্যের কাহিনি এখন বহু তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
সাফল্যের পথ সব সময় মসৃণ হয় না। কখনও আর্থিক সীমাবদ্ধতা, কখনও সুযোগের অভাব, আবার কখনও একের পর এক ব্যর্থতা মানুষের আত্মবিশ্বাসকে নাড়িয়ে দেয়। কিন্তু প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকলে যে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করা সম্ভব, আদিবা আনামের যাত্রা সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে দেশের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ১৪২তম স্থান অর্জন করেছেন তিনি।
আদিবার বাবা আসফা শেখ দীর্ঘদিন ধরে অটোরিকশা চালিয়ে পরিবারের খরচ চালিয়েছেন। আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও মেয়ের পড়াশোনা এবং ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নকে গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁর বাবা-মা। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, শিক্ষা মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। সেই বিশ্বাস থেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও আদিবাকে নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার উৎসাহ জুগিয়েছেন তাঁরা।
পুনের একটি কলেজ থেকে গণিতে ডিগ্রি অর্জনের পর সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার লক্ষ্যে UPSC পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন আদিবা। এই পরীক্ষায় সাফল্য অর্জনের জন্য দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, নিয়মিত পড়াশোনা এবং মানসিক দৃঢ়তার প্রয়োজন। আদিবার ক্ষেত্রেও পথটি সহজ ছিল না। প্রথম প্রচেষ্টায় সাফল্য আসেনি। দ্বিতীয় প্রচেষ্টাতেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় তাঁকে ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতাগুলিকে শেষ বলে মেনে নেননি তিনি। বরং নতুন করে প্রস্তুতি নিয়ে তৃতীয়বার পরীক্ষায় বসেন এবং শেষ পর্যন্ত সর্বভারতীয় ১৪২তম স্থান অর্জন করেন।
আদিবার এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে নিজের লক্ষ্যের প্রতি নিষ্ঠা এবং বাবা-মায়ের নিরন্তর সমর্থন। তাঁর কথায়, ছোটবেলায় এমন একটি ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যা তাঁকে বুঝিয়েছিল যে একজন সৎ প্রশাসনিক আধিকারিক মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারেন। সেই উপলব্ধি থেকেই প্রশাসনিক পরিষেবায় যোগ দেওয়ার ইচ্ছা আরও দৃঢ় হয়েছিল বলে জানা যায়।
তাঁর সাফল্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ সেই সমস্ত পরিবারের কাছে, যাঁরা আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে তোলার স্বপ্ন দেখেন। অনেক সময় প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে তরুণ-তরুণীরা নিজেদের স্বপ্ন নিয়ে সংশয়ে ভোগেন। আদিবার অভিজ্ঞতা তাঁদের মনে করিয়ে দেয়, ব্যর্থতা মানেই পথ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন উদ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াও সাফল্যের যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আদিবার পরিচয় নিয়ে ‘মহারাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম মহিলা IAS অফিসার’ হওয়ার যে দাবি প্রচারিত হচ্ছে, তা নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে UPSC পরীক্ষায় তাঁর ১৪২তম স্থান অর্জনের তথ্যই তাঁর সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর এই যাত্রা দেখিয়ে দেয়, একজন মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে পারিবারিক আর্থিক অবস্থা একমাত্র বিষয় নয়; অধ্যবসায়, সুযোগের সদ্ব্যবহার এবং পরিবারের সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
একজন অটোরিকশাচালকের মেয়ের UPSC-তে এমন সাফল্য তাই শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়, বরং বহু পরিবারের আশা ও স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি অনুপ্রেরণামূলক কাহিনি। প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে আদিবা আনাম যে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন, তা আগামী দিনে আরও অনেক তরুণ-তরুণীকে নিজেদের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগাতে পারে।