Saturday, 24 October, 2026 | কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
Khabar 24 Bangla
এই মুহূর্তে

আমাকে নায়ক বলবেন না শুধু বীজগুলো বাঁচিয়ে রাখুন”—শেষ ইচ্ছায় মন জয় করে নিলেন পদ্মশ্রী রামেট্টন।

Spread the love

মৃত্যুর আগে নিজের জন্য কোনও স্বীকৃতি চাননি তিনি। চেয়েছিলেন, বেঁচে থাকুক তাঁর সযত্নে আগলে রাখা ধানের বীজ। কেরলের আদিবাসী কৃষক চেরুভায়াল রামনের জীবন যেন শিখিয়ে গেল, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর রেখে যাওয়া কাজেই।

পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময় কেউ নিজের পরিবারের কথা ভাবেন, কেউ রেখে যেতে চান স্মৃতির চিহ্ন। কিন্তু কেরলের ওয়েনাড়ের আদিবাসী কৃষক চেরুভায়াল রামনের কাছে সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল তাঁর সংগ্রহে থাকা ঐতিহ্যবাহী ধানের বীজ। জীবনের শেষ অধ্যায়েও তাঁর একমাত্র চাওয়া ছিল, এই বীজগুলি যেন হারিয়ে না যায়। মানুষের ভালোবাসায় ‘রামেট্টন’ নামে পরিচিত এই কৃষকের জীবনসংগ্রাম আজও মনে করিয়ে দেয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছু সংরক্ষণ করে যাওয়াই জীবনের অন্যতম বড় সার্থকতা।

কেরলের ওয়েনাড় অঞ্চলে একসময় প্রায় ১৬০ ধরনের দেশীয় ধানের চাষ হতো বলে জানা যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ও পরিবর্তিত চাষের অভ্যাসের মধ্যে হারিয়ে যেতে থাকে সেই সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে নিজের সাধ্য অনুযায়ী দেশীয় ধানের প্রজাতিগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন রামেট্টন। তাঁর সংগ্রহে ছিল ৬০টিরও বেশি ঐতিহ্যবাহী ধানের প্রজাতির বীজ। একটি সাধারণ মাটির বাড়িতে সযত্নে রাখা সেই বীজগুলিই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

রামেট্টনের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল খুব অল্প বয়সে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে কাকার মৃত্যুর পর পরিবারের বীজ সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন তিনি। সেই থেকে ধানের বীজ রক্ষা করা তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। প্রতিটি প্রজাতির বীজকে যত্ন করে সংরক্ষণ করা, সেগুলির চাষ চালিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়াই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

১৯৭৮ সালে তিনি রাসায়নিক সার ব্যবহার বন্ধ করে দেন। দেশীয় ধানের প্রজাতি ও ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি ধরে রাখতে গিয়ে তাঁকে আর্থিক সমস্যারও মুখোমুখি হতে হয়। বছরে প্রায় ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতো তাঁর এই উদ্যোগে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, কখনও কখনও নিজের পরিবারের খাবারের জন্যও রেশনের চালের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তাঁকে। তবুও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি এই কৃষক।

কারণ, তাঁর কাছে ধানের বীজ শুধুমাত্র কৃষিকাজের উপকরণ ছিল না। প্রতিটি বীজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পূর্বপুরুষদের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় কৃষিসংস্কৃতি, মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার সম্ভাবনা। যে প্রজাতিগুলি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ছিল, সেগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন নিজের জীবনের উদ্দেশ্য।

রামেট্টনের মহানুভবতার আরেকটি দিক ছিল তাঁর বীজ বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা। অন্য কৃষকেরা তাঁর কাছে বীজ চাইতে এলে তিনি বিনামূল্যে তাঁদের হাতে তুলে দিতেন সেই অমূল্য সম্পদ। নিজের সংগ্রহের মধ্যে বীজ আটকে না রেখে অন্যের জমিতে, অন্যের চাষে সেই প্রজাতিগুলিকে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর কাছে প্রকৃত সংরক্ষণ। তাঁর এই কাজ শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ঐতিহ্যবাহী কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠেছিল।

তাঁর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। কিন্তু দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অসামরিক সম্মান পাওয়ার পরেও তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য বদলায়নি। খ্যাতি বা ব্যক্তিগত পরিচিতির চেয়ে তাঁর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল ধানের সেই প্রাচীন প্রজাতিগুলির ভবিষ্যৎ।

আজ রামেট্টনকে ঘিরে আবেগের কেন্দ্রে রয়েছে তাঁর রেখে যাওয়া সেই মূল্যবান বীজ এবং সেগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কৃষির উন্নতি মানে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়; দেশীয় বীজ, জীববৈচিত্র্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা কৃষিজ্ঞান সংরক্ষণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, একবার কোনও প্রাচীন প্রজাতি হারিয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা সব সময় সম্ভব হয় না।

আমরা অনেকেই চাই, পৃথিবী আমাদের কাজ মনে রাখুক। কিন্তু রামেট্টনের জীবন দেখিয়ে দেয়, নিজের নাম অমর করার চেষ্টা না করেও মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া যায়। তার জন্য প্রয়োজন নিষ্ঠা, ত্যাগ এবং নিজের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর ভবিষ্যতের কথা ভাবার মানসিকতা।

তাঁর জীবন ও শেষ ইচ্ছা আজ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি? শুধু সম্পদ, নাকি এমন কিছু মূল্যবান ঐতিহ্য, যা ভবিষ্যতেও মানুষের কাজে লাগবে?

চেরুভায়াল রামনের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার তাই শুধু কয়েক ডজন ধানের প্রজাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তা ছড়িয়ে রয়েছে কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া বীজে, মাটির প্রতি ভালোবাসায় এবং হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার অদম্য চেষ্টায়।

বিদায় রামেট্টন। আপনার কাজের প্রকৃত সম্মান হবে তখনই, যখন আপনার সযত্নে রক্ষা করা বীজ থেকে নতুন ফসল জন্মাবে, আর সেই ফসলের সঙ্গে বেঁচে থাকবে আপনার স্বপ্নও।

সম্পর্কিত খবর

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *