Saturday, 24 October, 2026 | কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
Khabar 24 Bangla
এই মুহূর্তে

নিজের উপার্জনে অভুক্তদের মুখে খাবার তুলে দেন দিল্লির ফুড ডেলিভারি কর্মী আকাশ সরোজ, মানবিক উদ্যোগে মন জয়

Spread the love

নিজের উপার্জনে অভুক্তদের মুখে খাবার তুলে দেন দিল্লির ফুড ডেলিভারি কর্মী আকাশ সরোজ, মানবিক উদ্যোগে মন জয়

দিনভর অন্যের বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেন তিনি, আর নিজের উপার্জনের টাকা থেকেই খাবার জোগান অসহায় মানুষের।

মাসে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা আয়, তার মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ করেন অভুক্তদের খাওয়াতে। দিল্লির আকাশ সরোজের এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, মানবিক হতে বড়লোক হওয়ার প্রয়োজন নেই।

মানবিকতা যে শুধু বড় বড় কথা বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা নিজের কাজের মধ্য দিয়ে দেখিয়ে চলেছেন দিল্লির ফুড ডেলিভারি কর্মী আকাশ সরোজ। প্রতিদিন মানুষের বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেওয়াই তাঁর পেশা। কিন্তু এই পেশার বাইরেও রয়েছে তাঁর জীবনের এক অন্য পরিচয়। নিজের পরিশ্রমে উপার্জন করা টাকা থেকে একটি অংশ খরচ করে তিনি খাবার তুলে দেন অভুক্ত, অসহায় এবং রাস্তায় থাকা মানুষদের হাতে। নিজের সংসার চালানোর দায়িত্ব সামলেও অন্যের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার এই উদ্যোগই তাঁকে আলাদা করে চিনিয়ে দিচ্ছে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ছয় বছর ধরে ফুড ডেলিভারির কাজ করছেন আকাশ। এই কাজের মাধ্যমে তাঁর মাসিক উপার্জন প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। প্রতিদিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে বেড়াতে হয় তাঁকে। নির্দিষ্ট সময়ে গ্রাহকের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া, দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় থাকা এবং প্রতিদিনের কাজের চাপ সামলানো—সব মিলিয়ে তাঁর জীবনও যথেষ্ট পরিশ্রমের। তবুও সেই ব্যস্ত জীবনের মধ্যেই তিনি সময় বের করে নেন তাঁদের জন্য, যাঁদের কাছে দু’বেলা খাবার জোগাড় করাটাই কঠিন লড়াই।

আকাশের আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যায় এই মানবিক উদ্যোগে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা তিনি খরচ করেন অসহায় মানুষদের খাওয়ানোর জন্য। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা ব্যয়ে খাবারের ব্যবস্থা করেন এবং সেই খাবার পৌঁছে দেন গৃহহীন ও রাস্তায় দিন কাটানো অভাবী মানুষের কাছে। অর্থাৎ, নিজের উপার্জনের একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেন এমন মানুষদের জন্য, যাঁদের সঙ্গে তাঁর কোনও ব্যক্তিগত পরিচয় বা স্বার্থের সম্পর্ক নেই। তাঁদের মুখে খাবার তুলে দেওয়াটাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

একবার ভাবুন, সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে নিজের জীবিকা নির্বাহ করতে হয় যে মানুষটিকে, তিনিই আবার নিজের আয়ের একটা বড় অংশ অন্যের জন্য ব্যয় করছেন। বর্তমান সময়ে যেখানে বহু মানুষের কাছে সংসারের খরচ সামলানোই বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে আকাশের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে মানবিকতার এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তাঁর এই কাজ শুধু ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধেরও পরিচয় দেয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই উদ্যোগের জন্য বাইরের সাহায্য বা স্পনসরশিপের উপর নির্ভর করতে চান না আকাশ। নিজের উপার্জন থেকে যতটা সম্ভব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর এই মনোভাবের মধ্যে রয়েছে আত্মনির্ভরতার পাশাপাশি অন্যের কষ্ট অনুভব করার মানসিকতা। তিনি হয়তো কোনও বড় সংস্থার মালিক নন, তাঁর হাতে নেই বিপুল অর্থসম্পদ। কিন্তু নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকেই তিনি এমন একটি কাজ করে চলেছেন, যার প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাছে।

তবে আকাশের এই মানবিক উদ্যোগের পিছনে রয়েছে আরও গভীর একটি কারণ। তাঁর এই পথচলার অনুপ্রেরণা তাঁর প্রয়াত বাবা। বাবার কাছ থেকেই তিনি শিখেছিলেন, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ধনী হওয়া জরুরি নয়। প্রয়োজন একটি সহানুভূতিশীল মন, অন্যের কষ্ট বুঝতে পারার ক্ষমতা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করার ইচ্ছা। বাবার কাছ থেকে পাওয়া সেই শিক্ষাকেই জীবনের আদর্শ করে নিয়েছেন আকাশ। আজ নিজের কাজের মধ্য দিয়ে সেই মূল্যবোধই বাস্তবে ফুটিয়ে তুলছেন তিনি।

আকাশের গল্প তাই কেবল একজন ফুড ডেলিভারি কর্মীর ব্যক্তিগত উদ্যোগের গল্প নয়। এটি এমন এক মানসিকতার পরিচয়, যেখানে নিজের প্রয়োজনের পাশাপাশি অন্যের প্রয়োজনের কথাও ভাবা হয়। রাস্তায় থাকা কোনও ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে একবেলার খাবার হয়তো সামান্য সাহায্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেই মুহূর্তে ওই খাবারই তাঁর কাছে অনেক বড় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে। অভাবের মধ্যে দিন কাটানো মানুষের জন্য এই ছোট ছোট উদ্যোগই কখনও কখনও বেঁচে থাকার লড়াইয়ে কিছুটা ভরসা জোগায়।

সমাজে পরিবর্তন আনার জন্য সব সময় বড় কোনও পদক্ষেপের প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় একজন মানুষের ছোট্ট উদ্যোগও অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারে। আকাশ সরোজের কাজ সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। নিজের উপার্জন থেকে সামান্য অর্থ আলাদা করে রাখার মধ্য দিয়েও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। সাহায্য করার জন্য বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অপেক্ষা করতে হয় না; প্রয়োজন সদিচ্ছা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা।

দিনের শেষে আকাশ আবারও নিজের কাজে ফিরে যান। মানুষের বাড়িতে খাবার পৌঁছে দেওয়াই তাঁর জীবিকার পথ। কিন্তু সেই কাজের উপার্জন থেকেই যখন তিনি কোনও অভুক্ত মানুষের হাতে খাবার তুলে দেন, তখন তাঁর পেশার সঙ্গে যুক্ত হয় এক অন্য মানবিক পরিচয়। নিজের পরিশ্রমের অর্থ দিয়ে অন্যের ক্ষুধা মেটানোর এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে সমাজের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

আকাশ সরোজের এই উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবিকতার মূল্য টাকার অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যায় না। কারও পাশে দাঁড়াতে কোটিপতি হতে হয় না, হতে হয় সংবেদনশীল। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেও বদলে যেতে পারে কোনও মানুষের কঠিন দিনের অভিজ্ঞতা। আর সেই কারণেই দিল্লির এই ফুড ডেলিভারি কর্মীর গল্প শুধু প্রশংসার নয়, অন্যদেরও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জোগানোর মতো একটি কাহিনি।

সম্পর্কিত খবর

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *