Tuesday, 27 October, 2026 | কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
Khabar 24 Bangla
এই মুহূর্তে

জোড়াফুল প্রতীক মামলা: সুপ্রিম কোর্টে ঋতব্রত শিবিরকে আরও ১০ দিন সময়, পাল্টা জবাবের সুযোগ পেল কালীঘাটও

জোড়াফুল প্রতীক মামলা: সুপ্রিম কোর্টে ঋতব্রত শিবিরকে আরও ১০ দিন সময়, পাল্টা জবাবের সুযোগ পেল কালীঘাটও

তৃণমূল কংগ্রেসের জোড়াফুল প্রতীকের অধিকার কার হাতে থাকবে? দলের বিপুল আর্থিক তহবিলের নিয়ন্ত্রণই বা পাবে কোন পক্ষ? এই দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে কেন্দ্র করে চলা আইনি লড়াইয়ে নতুন মোড়। সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা জমা দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত ১০ দিন সময় পেল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক তৃণমূল শিবির। তবে একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবিরকেও পাল্টা হলফনামা বা রিজয়েন্ডার জমা দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। ফলে মামলার নিষ্পত্তির আগে দুই পক্ষের আইনি বক্তব্য ও নথিপত্র খতিয়ে দেখার প্রক্রিয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

হলফনামা জমা দেওয়ার সময়সীমা ঘিরেই নতুন জট

এই মামলায় সোমবার ছিল দুই পক্ষের হলফনামা জমা দেওয়ার নির্ধারিত শেষ দিন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবির নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তাদের প্রয়োজনীয় আইনি নথি ও বক্তব্য আদালতে পেশ করে। অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক তৃণমূলের পক্ষ থেকে হলফনামা জমা দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়।

ঋতব্রত শিবিরের আইনজীবীরা আদালতের কাছে আরও দুই সপ্তাহ সময় দেওয়ার আবেদন জানান। দুই পক্ষের সওয়াল-জবাব শোনার পর সুপ্রিম কোর্ট শেষ পর্যন্ত হলফনামা জমা দেওয়ার জন্য ১০ দিনের অতিরিক্ত সময় মঞ্জুর করে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে ঋতব্রত শিবির তাদের বক্তব্য ও দাবির সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথি আদালতে পেশ করার আরও একটি সুযোগ পেল। তবে অতিরিক্ত সময় পাওয়া মানেই মামলায় কোনও পক্ষের দাবি আদালত মেনে নিয়েছে, এমন নয়। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নির্ভর করবে দুই পক্ষের বক্তব্য, দাখিল করা নথি এবং প্রযোজ্য আইনি বিধানের ওপর।

কালীঘাট শিবিরের জন্যও পাল্টা জবাবের সুযোগ

সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, ঋতব্রত শিবিরের হলফনামা জমা পড়ার পর তার বিরুদ্ধে পাল্টা উত্তর বা রিজয়েন্ডার পেশ করতে পারবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবির। আদালত এ জন্য পরবর্তী ১০ দিনের সময়সীমার কথা জানিয়েছে।

এর ফলে ঋতব্রত শিবির তাদের বক্তব্য আদালতে পেশ করার পর মমতা শিবিরও সেই বক্তব্যের বিরোধিতা করতে বা নিজেদের অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে পারবে। প্রয়োজনীয় নথি ও যুক্তির মাধ্যমে তারা পাল্টা জবাব দেওয়ার সুযোগ পাবে।

আইনি প্রক্রিয়ায় এই পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কোনও মামলায় এক পক্ষের বক্তব্য জমা পড়ার পর অপর পক্ষের আপত্তি, ব্যাখ্যা এবং প্রাসঙ্গিক নথি বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও স্পষ্ট করতে পারে। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করার পরই মামলার পরবর্তী পর্যায়ে এগোতে পারে আদালত।

অতিরিক্ত সময় দেওয়ার বিরোধিতা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের

ঋতব্রত শিবিরকে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন মমতা শিবিরের বর্ষীয়ান সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে যখন এক পক্ষ সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি ও প্রমাণ আদালতে জমা দিতে পেরেছে, তখন অন্য পক্ষের ক্ষেত্রেও সময়সীমা মেনে চলা উচিত।

তাঁর প্রশ্ন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নথি জমা দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনও পক্ষ কেন অতিরিক্ত সময় পাবে? তাঁর মতে, এভাবে এক পক্ষকে বাড়তি সময় দেওয়ার বিষয়টি আইনি ন্যায্যতার প্রশ্ন তুলতে পারে।

তবে আদালত ঋতব্রত শিবিরকে ১০ দিন সময় দেওয়ার পাশাপাশি মমতা শিবিরের পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকারও নিশ্চিত করেছে। ফলে দুই পক্ষের বক্তব্য আদালতে পেশ করার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকছে।

শুনানির পরে কী বললেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়?

আদালতের শুনানির পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঋতব্রত শিবিরের দাবির সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বৈধ নথি ছাড়াই অবাস্তব দাবি তোলা হয়েছে।

তিনি জানান, আদালত ঋতব্রত শিবিরকে অতিরিক্ত ১০ দিন সময় দিলেও তাদের জমা দেওয়া হলফনামার বিরুদ্ধে পাল্টা আপত্তি ও প্রয়োজনীয় নথি পেশ করার সুযোগ মমতা শিবিরের কাছে রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের দাবির জবাব দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

তবে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য তাঁর নিজস্ব অবস্থান ও অভিযোগের প্রতিফলন। ঋতব্রত শিবিরের দাবিগুলি বৈধ কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আদালতেরই।

হলফনামা নিয়ে যাওয়ার ট্রাকে হামলার অভিযোগ ঋতব্রতর

মামলার আইনি দিকের পাশাপাশি নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে নথি পরিবহণের সময় হামলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, তাঁদের হলফনামা নিয়ে যাওয়া একটি ট্রাকে হামলা চালানো হয়েছিল এবং নথি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল।

তাঁর আরও দাবি, দলীয় কর্মীদের তৎপরতায় সেই চেষ্টা প্রতিহত করা সম্ভব হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের বক্তব্য তুলে ধরে ঋতব্রত এই ঘটনাকে ‘চার্টার্ড ফ্লাইট সংস্কৃতি’ বনাম ‘তৃণমূল স্তরের মানুষের লড়াই’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে এই অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য, কোনও তদন্তের ফলাফল কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখানে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই অভিযোগটিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

জোড়াফুল প্রতীক ও আর্থিক তহবিল নিয়ে কেন গুরুত্বপূর্ণ এই মামলা?

এই মামলার গুরুত্ব শুধু দুই রাজনৈতিক শিবিরের বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জোড়াফুল প্রতীকের অধিকার এবং দলের আর্থিক তহবিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার নিষ্পত্তি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সাংগঠনিক অবস্থান ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে প্রতীকের চূড়ান্ত অধিকার, তহবিলের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে এখনই কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সুযোগ নেই। আদালতের সামনে যে প্রশ্নগুলি রয়েছে, সেগুলির নিষ্পত্তি হবে সংশ্লিষ্ট নথি, যুক্তি এবং প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে।

এই মামলার সঙ্গে পুরভোটের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে আদালতের এই অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তের ফলে পুরভোটের সূচি, প্রতীক ব্যবহারের অধিকার কিংবা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরাসরি কী প্রভাব পড়বে, তা নিশ্চিত করে বলার মতো তথ্য এখনও নেই। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কবে হতে পারে পরবর্তী শুনানি?

অতিরিক্ত ১০ দিনের সময়সীমা এবং তার পরে পাল্টা হলফনামা জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ার কারণে মামলার পরবর্তী পর্যায়ে পৌঁছতে আরও সময় লাগতে পারে। আইনজীবী মহলের একাংশের অনুমান, পরবর্তী শুনানি নভেম্বর মাসের শেষের দিকে হতে পারে। তবে পরবর্তী শুনানির নির্দিষ্ট তারিখ আদালতের আনুষ্ঠানিক তালিকা বা নির্দেশের ভিত্তিতেই নিশ্চিত করা যাবে।

সব মিলিয়ে, জোড়াফুল প্রতীক ও আর্থিক তহবিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আইনি লড়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে। একদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের হলফনামা, অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে মমতা শিবিরের পাল্টা বক্তব্য—দুই পক্ষের অবস্থান খতিয়ে দেখেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে সুপ্রিম কোর্ট।

এখন নজর থাকবে, অতিরিক্ত সময়ের মধ্যে ঋতব্রত শিবির কী কী নথি পেশ করে, তার জবাবে কালীঘাট শিবির কী যুক্তি তুলে ধরে এবং শেষ পর্যন্ত জোড়াফুল প্রতীক ও আর্থিক তহবিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আদালত কী সিদ্ধান্তে পৌঁছয়।

সম্পর্কিত খবর

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *