রাজাভাতখাওয়ায় আন্দোলনের ঝাঁঝ বাড়ছে, ডুয়ার্সকন্যার পাশে আমরণ রিলে অনশনের হুমকি!
জঙ্গলের অধিকারের দাবিতে ২১ দিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বক্সার ১৮টি গ্রামসভার বাসিন্দারা। বনদপ্তরের সঙ্গে আলোচনার দাবি পূরণ না হওয়ায় এবার আন্দোলন আরও বৃহত্তর আকার নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। বুধবারের মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে আলিপুরদুয়ারের প্রশাসনিক ভবন ডুয়ার্সকন্যার পাশে আমরণ রিলে অনশনে বসার ঘোষণা করেছেন আন্দোলনকারীরা। অন্যদিকে, আগামী ১ নভেম্বর আলোচনায় বসার প্রস্তাব দিয়েছেন বনমন্ত্রী মনোজকুমার ওরাওঁ। ফলে একদিকে আন্দোলনের উত্তাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বনবস্তিবাসীদের দাবি ঘিরে বক্সার পর্যটনেও তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা।
জঙ্গলের অধিকারের দাবিতে রাজাভাতখাওয়ায় বক্সার ১৮টি গ্রামসভার যৌথ সংগ্রামী মঞ্চের আন্দোলন সোমবার ২১ দিনে পড়ে। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, এদিন আন্দোলনকারীরা রাজাভাতখাওয়ায় রাজ্য সড়কের উপরে অবস্থিত বনদপ্তরের টিকিট কাউন্টারের সামনে ধরনা ও অবস্থান বিক্ষোভ করেন। তাঁদের অভিযোগ ও প্রশ্ন, পূর্ত দপ্তরের রাজ্য সড়কের উপরে থাকা ওই টিকিট কাউন্টারে কী কারণে টাকা নেওয়া হচ্ছে? এই বিষয়টির স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েই বনদপ্তরের কাছে ডেপুটেশন জমা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভের জেরে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা বন্ধ থাকে বনদপ্তরের ওই টিকিট কাউন্টার। পরে বিক্ষোভকারীরা মিছিল করে রাজাভাতখাওয়া রেঞ্জ অফিসে পৌঁছন এবং নিজেদের দাবিদাওয়া জানিয়ে ডেপুটেশন দেন। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়েও বনদপ্তরের কাছ থেকে আলোচনায় বসার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। সেই কারণেই এবার আন্দোলনের পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।
আন্দোলনকারীদের অন্যতম অয়ন নাইডু জানান, তাঁরা টানা ২১ দিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। বনদপ্তরকে ২৫ তারিখের মধ্যে তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় বসার সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলোচনা না হলে সোমবার থেকে আরও বড় আকারে আন্দোলনে নামা হবে। কিন্তু বনদপ্তর আলোচনায় না বসায় পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী টিকিট কাউন্টারের সামনে ধরনা ও বিক্ষোভ করা হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
অন্যদিকে, বনজন শ্রমজীবী মঞ্চের উত্তরবঙ্গের আহ্বায়ক লালসিং ভূজেল জানিয়েছেন, বনদপ্তরকে দেওয়া সময়সীমা শেষ হয়ে গিয়েছে। তাই বুধবার থেকে ডুয়ার্সকন্যার পাশে আমরণ রিলে অনশনে বসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচিতে বনবস্তিবাসীরা পর্যায়ক্রমে অংশ নেবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। আন্দোলনকারীদের দাবি, জঙ্গলের অধিকারের প্রশ্নে তাঁদের বক্তব্য ও দাবিগুলির যথাযথ সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তাঁরা।
এদিকে, আন্দোলনের জেরে বক্সার পর্যটনেও প্রভাব পড়ছে। সোমবার রাজাভাতখাওয়া ও জয়ন্তী থেকে সাফারি বন্ধ থেকেছে। পাশাপাশি বক্সা পাহাড়, জয়ন্তী এবং রাজাভাতখাওয়ার হোমস্টেগুলিও এদিন বন্ধ ছিল। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই আন্দোলনের কারণে পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা এখনও কাটার কোনও স্পষ্ট লক্ষণ নেই। আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে পর্যটনকেন্দ্রগুলির পরিস্থিতি কোন দিকে এগোবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে বনদপ্তরের তরফে আগামী ১ নভেম্বর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, তাঁদের কাছে এই প্রস্তাব মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। তাই লিখিত বা আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা এই প্রস্তাবকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে নারাজ। অন্যদিকে, বনমন্ত্রী মনোজকুমার ওরাওঁ জানিয়েছেন, আগামী ১ নভেম্বর আলোচনায় বসার জন্য আন্দোলনকারীদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
এখন মূল প্রশ্ন, বনদপ্তর ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে নির্ধারিত দিনে আদৌ আলোচনা হয় কি না এবং আলোচনার মাধ্যমে জঙ্গলের অধিকারের দাবিতে চলা এই আন্দোলনের কোনও সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসে কি না। তার আগেই বুধবার থেকে ডুয়ার্সকন্যার পাশে আমরণ রিলে অনশন শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একদিকে বনবস্তিবাসীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন, অন্যদিকে বক্সার পর্যটনে অচলাবস্থা—সব মিলিয়ে রাজাভাতখাওয়াকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি এখন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।