Tuesday, 27 October, 2026 | কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
Khabar 24 Bangla
এই মুহূর্তে

সুপ্রিম কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনা! প্রমাণ ছাড়াই ৬ বছর জেলে নির্দোষ যুবক, যোগী সরকারকে ৬ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

সুপ্রিম কোর্টের তীব্র ভর্ৎসনা! প্রমাণ ছাড়াই ৬ বছর জেলে নির্দোষ যুবক, যোগী সরকারকে ৬ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ

নয়াদিল্লি: পুলিশের তদন্তে চরম গাফিলতি, প্রমাণের অভাব এবং তদন্তের নামে সাজানো কাহিনির অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারকে কড়া বার্তা দিল সুপ্রিম কোর্ট। একটি অপহরণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত হয়ে টানা ছয় বছর কারাবন্দি থাকার পর নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া আগ্রার বাসিন্দা অরুণের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এক মাসের মধ্যে ওই যুবককে ৬ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্ষতিপূরণের অর্থ না দিলে বার্ষিক ১৮ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণ, একজন নির্দোষ মানুষের জীবনের মূল্যবান ছয়টি বছর হারিয়ে যাওয়ার তুলনায় এই ক্ষতিপূরণের পরিমাণও যথেষ্ট নয়।

কীভাবে একটি খুনের মামলায় জড়িয়ে পড়লেন অরুণ?

ঘটনাটি উত্তরপ্রদেশের আগ্রার। অভিযোগ, ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে আগ্রার অছনেরা থানা এলাকার একটি অপহরণ ও খুনের মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে জেলে বন্দি ছিলেন অরুণ। দীর্ঘ সময় ধরে কারাবন্দি থাকার পর অবশেষে ২০২৬ সালের ২৩ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর নিম্ন আদালতে দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ না মেলায় তাঁকে বেকসুর খালাস করা হয়।

কিন্তু প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, যে মামলায় শেষ পর্যন্ত অরুণের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণই পাওয়া গেল না, সেই মামলায় তাঁকে এত বছর কারাগারে থাকতে হল কেন? তদন্তের শুরুতেই কি পুলিশের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল? যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহ না করেই কীভাবে একজন ব্যক্তিকে এমন গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করা হল? এই প্রশ্নগুলিই পরবর্তীতে বিচারব্যবস্থার নজরে আসে।

এফআইআরেই নাম ছিল না অরুণের!

মামলার নথি পর্যালোচনা করতে গিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অসংগতি নজরে আসে সুপ্রিম কোর্টের। বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের ডিভিশন বেঞ্চ নিম্ন আদালতের প্রায় ১০০ পৃষ্ঠার রায় খতিয়ে দেখে তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

উপলব্ধ মামলার বিবরণ অনুযায়ী, মূল এফআইআর বা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় নথিভুক্ত জবানবন্দিতে অরুণের নাম ছিল না। তা সত্ত্বেও পরবর্তী তদন্তে তাঁকে মামলার অভিযুক্ত হিসেবে যুক্ত করা হয়। অভিযোগ, অন্য এক অভিযুক্তের কাছ থেকে পুলিশের আদায় করা স্বীকারোক্তি এবং অস্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজের ওপর নির্ভর করেই অরুণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়েছিল।

এই পরিস্থিতিতে তদন্তকারীরা কীসের ভিত্তিতে অরুণকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, সেই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা এবং সেই প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া পুলিশের দায়িত্ব। এই মামলায় সেই মৌলিক প্রক্রিয়াই যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

পেট্রোল দিয়ে দেহ পোড়ানোর দাবি, কিন্তু কোথায় ফরেন্সিক প্রমাণ?

তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ভুক্তভোগীকে পানীয়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর প্রায় ৫৫ লিটার পেট্রোল কিনে মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগও মামলার তদন্তে উঠে আসে।

কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণে তদন্তের এই অংশ নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন দেখা দেয়। যে পেট্রোল পাম্প থেকে পেট্রোল কেনা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়, সেটি চিহ্নিত করার যথাযথ প্রমাণ কোথায়? পেট্রোল বহনের জন্য ব্যবহৃত ক্যানের রাসায়নিক পরীক্ষা করা হয়েছিল কি? ঘটনাস্থল ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করানোর নির্ভরযোগ্য নথি কোথায়? মামলায় উদ্ধার হওয়া বলে উল্লেখ করা কঙ্কাল ও হাড়ের ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টই বা কোথায়?

উপলব্ধ বিবরণ অনুযায়ী, তদন্তকারীরা এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করতে পারেননি। ফলে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। খুনের মতো সংবেদনশীল মামলায় শুধু একটি কাহিনি তৈরি করলেই চলে না; সেই কাহিনির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের পক্ষে বৈজ্ঞানিক ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকা জরুরি। অন্যথায় নির্দোষ ব্যক্তির জীবন ও স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।

পুলিশের তদন্ত নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কড়া পর্যবেক্ষণ

তদন্তকারী আধিকারিকদের গাফিলতি ও অপেশাদারিত্ব নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্ট। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও যথাযথভাবে গ্রহণ করেনি।

একজন নাগরিকের বিরুদ্ধে অপহরণ ও খুনের মতো গুরুতর অভিযোগ আনার আগে তদন্তের প্রতিটি ধাপ সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। সাক্ষ্য, ফরেন্সিক তথ্য, প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ—সবকিছুর ভিত্তিতেই তদন্তের গতিপথ নির্ধারণ হওয়া উচিত। অথচ এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের ঘাটতি এবং তদন্তের একাধিক অসংগতি সামনে এসেছে বলে জানা যাচ্ছে।

একজন নির্দোষ ব্যক্তিকে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতাই ক্ষুণ্ণ হয় না, তাঁর পারিবারিক জীবন, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অরুণের ক্ষেত্রেও ছয় বছরের কারাবাসের পরিণতি কতটা গভীর, তা আদালতের ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ থেকে স্পষ্ট।

এক মাসের মধ্যে ৬ লক্ষ টাকা, না দিলে ১৮ শতাংশ সুদ

এই পরিস্থিতিতে অরুণকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। উত্তরপ্রদেশ সরকারকে এক মাসের মধ্যে ৬ লক্ষ টাকা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সেই অর্থ পরিশোধ করা না হলে বার্ষিক ১৮ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে বলেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে আদালতের পর্যবেক্ষণে শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টিই গুরুত্ব পায়নি। ছয়টি মূল্যবান বছর একজন মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়ার যে অপূরণীয় ক্ষতি, তার তুলনায় ৬ লক্ষ টাকা অত্যন্ত অপ্রতুল বলেও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিচারপতিদের বেঞ্চ।

কারণ, হারিয়ে যাওয়া সময় অর্থ দিয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। দীর্ঘ কারাবাসের কারণে একজন মানুষের কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মুক্তি পাওয়ার পরেও সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। তাই এই ধরনের মামলায় ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি তদন্তব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

তদন্তের গাফিলতি নিয়ে ফের উঠল বড় প্রশ্ন

অরুণের ঘটনা পুলিশের তদন্তপ্রক্রিয়া, নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং বিচারব্যবস্থার দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। কোনও অপরাধের তদন্ত করতে গিয়ে প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করা যেমন জরুরি, তেমনই নির্দোষ ব্যক্তিকে মিথ্যা বা দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্ত না করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে খুন ও অপহরণের মতো গুরুতর মামলায় তদন্তের প্রতিটি ধাপ নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং প্রমাণনির্ভর হওয়া প্রয়োজন। কারণ, তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য কখনও কখনও একজন নির্দোষ মানুষকে বছরের পর বছর ধরে দিতে হয়।

সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশ সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে এসেছে—তদন্তের নামে গাফিলতি বা প্রমাণের ঘাটতির কারণে কোনও নির্দোষ নাগরিকের স্বাধীনতা নষ্ট হলে তার দায় কে নেবে? অরুণের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ মিললেও তাঁর জীবনের হারিয়ে যাওয়া ছয়টি বছর আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই এই ঘটনা শুধু একজন যুবকের ন্যায়বিচার পাওয়ার কাহিনি নয়, বরং দেশের তদন্তব্যবস্থায় সতর্কতা, পেশাদারিত্ব এবং জবাবদিহির গুরুত্ব মনে করিয়ে দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।

সম্পর্কিত খবর

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *