Sunday, 25 October, 2026 | কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
Khabar 24 Bangla
এই মুহূর্তে

দরজায় ছিল কাপড়, টিনের চাল ফুটো! চরম অভাব থেকে উঠে আজ বহু নারীর অনুপ্রেরণা প্রীতিলতা সরকার

দরজায় ছিল কাপড়, টিনের চাল ফুটো! চরম অভাব থেকে উঠে আজ বহু নারীর অনুপ্রেরণা প্রীতিলতা সরকার

একসময় অভাবের কারণে বিছানার বদলে মেঝেতে রাত কাটাতে হতো, ঘরের দরজার বদলে ঝুলত কাপড়। বৃষ্টির জলে ভিজত ঘর, অথচ একটি টিনের চালের জন্য পঞ্চায়েতের দরজায় দরজায় ঘুরেও মেলেনি সাহায্য। এমনকি অভাবের দিনে ১০ টাকা ধার দিতেও ভরসা পাননি গ্রামের অনেকে। সেই কঠিন পরিস্থিতি পেরিয়েই আজ নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন প্রীতিলতা সরকার। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের জীবন বদলানোর পাশাপাশি বহু নারীকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন তিনি। তাঁর জীবনসংগ্রামের কাহিনি আজ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার।

অভাব, অপমান আর প্রতিকূলতাকে সঙ্গী করেই শুরু হয়েছিল পথচলা

কোচবিহারের দিনহাটা ১ নম্বর ব্লকের ছোট্ট গ্রাম জারাবাড়িতে বাড়ি প্রীতিলতা সরকারের। বর্তমানে তিনি আইসিডিএস কেন্দ্রে সহকারী হিসেবে শিশুদের খাবার পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি দিনহাটা মহিলা কো-অপারেটিভের সেক্রেটারি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। কিন্তু আজকের এই পরিচিতি ও সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, অসংখ্য বাধা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য মানসিকতা।

প্রীতিলতার বিয়ের আগের জীবন মোটামুটি ভালোভাবেই কাটছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই তাঁর জীবনে নেমে আসে কঠিন সময়। যৌথ পরিবারে জায়গা না হওয়ায় বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথায় তাঁকে স্বামীর সঙ্গে আলাদা হয়ে যেতে হয়। নতুন সংসার শুরু করার মতো পর্যাপ্ত সামর্থ্যও ছিল না তাঁদের। যে ঘরে তাঁদের থাকতে হয়েছিল, সেখানে ছিল মাত্র একটি বিছানা এবং একটি কাঠের দরজা।

পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে যখন শ্বশুরমশাই সেই বিছানা ও দরজাটি ফেরত চান। আত্মসম্মানের কথা ভেবে প্রীতিলতা দুটিই ফিরিয়ে দেন। এরপর তাঁদের সংসারে কার্যত দরজা ছাড়াই রাত কাটানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঘরের প্রবেশপথে কাপড় ঝুলিয়ে কোনওরকমে রাত কাটাতে হতো। মেয়ের এই কষ্টের কথা জানতে পেরে তাঁর বাবা একটি বাঁশের দরজা তৈরি করে দিয়েছিলেন। সেই সামান্য ব্যবস্থাই তখন তাঁদের কাছে অনেক বড় ভরসা হয়ে উঠেছিল।

ফুটো টিনের চাল, বৃষ্টির জল আর অসহায় দিনগুলি

সংসারের কষ্ট শুধু দরজা কিংবা বিছানার অভাবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মাথার উপরে টিনের চাল থাকলেও তা দিয়ে বৃষ্টির জল পড়ত। রাতের পর রাত ঠিকমতো ঘুমোনো যেত না। একটি টিনের ছাপরা তৈরি করার আশায় প্রীতিলতা পঞ্চায়েতের দরজায় দরজায় ঘুরেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই আবেদন থেকে কোনও সাহায্য মেলেনি বলে জানা যায়।

একদিকে মাথার উপরে নিরাপদ ছাদের অভাব, অন্যদিকে সংসার চালানোর দায়িত্ব—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই ছিল নতুন লড়াই। সংসারে অভাব এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছিল যে, অনেক সময় খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ত। গ্রামের মানুষের কাছে ১০ টাকা ধার চেয়েও ভরসা পাননি তিনি। এমন দিনও এসেছে, যখন বাড়িতে এক দানা চাল ছিল না। আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁকে না খেয়ে সারাদিন কাটাতে হয়েছে বলে তাঁর জীবনসংগ্রামের কাহিনিতে উঠে এসেছে।

তবুও পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করেননি প্রীতিলতা। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু ভাগ্যের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। সংসারকে বাঁচাতে হলে নিজেদেরই উপার্জনের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

স্বামীর দিনমজুরি, নিজের টিউশন—এভাবেই চলত সংসার

সংসারের আর্থিক অনটন সামলাতে তাঁর স্বামী অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। অন্যদিকে প্রীতিলতা শিশুদের টিউশন পড়াতেন এবং লোকের বাড়িতে তামাক বাঁধার কাজ করতেন। পাশাপাশি তাঁরা দুজনে লিজ নিয়ে পাট ও তামাক চাষের কাজও শুরু করেন। যে কাজই সামনে এসেছে, সংসারের কথা ভেবে তা করার চেষ্টা করেছেন তাঁরা।

শারীরিক অসুস্থতা এবং পেটের তীব্র যন্ত্রণাও তাঁর পথ আটকে রাখতে পারেনি। সংসারের দায়িত্ব সামলে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন তিনি কখনও ছেড়ে দেননি। জীবনের প্রতিটি কঠিন অভিজ্ঞতা যেন তাঁকে আরও দৃঢ় করে তুলেছিল।

এই দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যেই প্রীতিলতার জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয় স্বনির্ভর গোষ্ঠী। তাঁর জীবন বদলের পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন সত্যরঞ্জন দেব স্যার। ২০০১ সালে স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা সেল্ফ হেল্প গ্রুপের মাধ্যমে ১২ জনকে নিয়ে একটি দল গঠিত হয়। এই উদ্যোগই পরবর্তী সময়ে প্রীতিলতার জীবনে নতুন দিশা দেখায়।

স্বনির্ভর গোষ্ঠীর হাত ধরে শুরু হয় নতুন অধ্যায়

২০০৩ সালে প্রীতিলতা ট্রেনার মাস্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কাজের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আরও গভীর হয়। এই কাজের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু নিজের জীবনে পরিবর্তন আনার সুযোগই পাননি, বরং অন্যদেরও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন।

তবে পথটা সহজ ছিল না। সমাজের নানা কথা, মানুষের কটাক্ষ এবং অপমান তাঁকে বারবার আঘাত করেছে। কিন্তু তিনি সেই অপমানকে দুর্বলতার কারণ হতে দেননি। বরং নিজের লক্ষ্যে পৌঁছনোর জেদ আরও বাড়িয়েছেন।

প্রীতিলতার কাছে পড়াশোনা ছিল অত্যন্ত প্রিয়। সংসার, সন্তান এবং আর্থিক অনটনের মতো একাধিক দায়িত্ব সামলেও তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বহু বাধা পেরিয়ে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেন এবং উত্তীর্ণ হন। তাঁর কাছে এই সাফল্য ছিল নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার আরও একটি ধাপ।

২০০৭ সালে সুযোগ এলেও থমকে যায় চাকরির স্বপ্ন

২০০৭ সালে অঙ্গনওয়াড়ির পরীক্ষায় বসার সুযোগ পান প্রীতিলতা। কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হন তিনি। কিন্তু প্যানেল সংক্রান্ত মামলার কারণে তাঁর যোগদানের প্রক্রিয়া আটকে যায়। এত কষ্ট করে সাফল্য অর্জনের পরও চাকরিতে যোগ দিতে না পারা তাঁর কাছে ছিল বড় ধাক্কা।

তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। জীবনের আগের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছিল, একবার বাধা এলেই পথ শেষ হয়ে যায় না। তাই অপেক্ষা, পরিশ্রম এবং নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি।

কিন্তু এরই মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও নেমে আসে আরও একটি কঠিন অধ্যায়।

তিন মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয়, দীর্ঘ দুই বছরের বিচ্ছেদ

অঙ্গনওয়াড়ির কাজ সংক্রান্ত একটি বিষয়ে এক সহপাঠীর কথায় স্বামীকে না জানিয়ে দিনহাটার সিডিপিও অফিসে গিয়েছিলেন প্রীতিলতা। বিষয়টি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতে তাঁর স্বামী ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন বলে তাঁর জীবনসংগ্রামের কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে।

তখন তাঁর তিনটি ছোট মেয়ে। সন্তানদের নিয়ে প্রীতিলতা বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। শুরু হয় জীবনের আরও এক কঠিন লড়াই। দীর্ঘ দুই বছর তাঁকে আলাদা থাকতে হয়। নিজের কষ্ট বুকে চেপে রেখে তিন মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

একদিকে সংসার ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণা, অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা—সবকিছুর মধ্যেও তিনি নিজের দায়িত্ব থেকে সরে আসেননি। জীবনে বারবার বাধা এলেও তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন পরিস্থিতির পরিবর্তন হবেই।

অবশেষে ২০১২ সালে পরিবারের উদ্যোগে ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটে। তাঁর স্বামী নিজের ভুল বুঝতে পেরে প্রীতিলতাকে সম্মানের সঙ্গে আবার বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। ধীরে ধীরে তাঁদের সংসারেও ফিরে আসে স্থিতি।

দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, ২০১৭ সালে হাতে এল যোগদানের চিঠি

জীবনের এত প্রতিকূলতার মধ্যেও অঙ্গনওয়াড়ির চাকরির স্বপ্ন ছেড়ে দেননি প্রীতিলতা। অবশেষে ২০১৭ সালে তাঁর হাতে আসে অঙ্গনওয়াড়ির অফিসিয়াল যোগদানের চিঠি। দীর্ঘ অপেক্ষা, পরিশ্রম এবং অনিশ্চয়তার পর এই সাফল্য তাঁর জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়।

চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর তাঁর জীবনে ধীরে ধীরে স্থিতি আসে। একসময় যে সংসারে মাথার উপরে নিরাপদ ছাদের অভাব ছিল, সেই সংসারেই পরবর্তী সময়ে নতুন ঘর তৈরি হয়। তাঁর তিন মেয়েরও সুন্দরভাবে বিয়ে হয়। যে স্বামীর সঙ্গে একসময় ভুল বোঝাবুঝির কারণে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তিনিই প্রীতিলতার স্বপ্নপূরণের পথে সহযোগী হয়ে ওঠেন।

নিজের জীবন বদলে আজ অন্য নারীদেরও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখান

প্রীতিলতা সরকারের কাহিনি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি অভাবের সঙ্গে লড়াই করে ঘুরে দাঁড়ানোর, আত্মসম্মান ধরে রাখার এবং নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকার গল্প। একসময় যাঁকে একটি টিনের চালের জন্য মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরতে হয়েছিল, আজ তিনিই নিজের কর্মজীবন এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে অন্য নারীদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছেন।

আইসিডিএস কেন্দ্রে শিশুদের পরিষেবা দেওয়া থেকে শুরু করে দিনহাটা মহিলা কো-অপারেটিভের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন—জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। তাঁর পথচলা দেখায়, আর্থিক অনটন কিংবা সামাজিক অপমান কোনও মানুষের জীবনের শেষ কথা হতে পারে না।

স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মতো উদ্যোগ যে নারীদের জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, প্রীতিলতার অভিজ্ঞতা তারই একটি উদাহরণ। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেলে একজন নারী শুধু নিজের জীবনই বদলাতে পারেন না, পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি সমাজের অন্য নারীদের কাছেও আশার আলো হয়ে উঠতে পারেন।

একসময় ফুটো টিনের চালের নীচে বৃষ্টির জল সামলে রাত কাটানো সেই নারী আজ বহু মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন মনে করিয়ে দেয়, প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক, স্বপ্ন দেখা বন্ধ করা চলবে না। কারণ সাফল্য সব সময় সহজ পথে আসে না; কখনও কখনও সেই সাফল্যের পিছনে থাকে বছরের পর বছর ধরে চলা নীরব সংগ্রাম।

প্রীতিলতা সরকারের জীবন আমাদের শেখায়, হার না মানার মানসিকতা, কঠোর পরিশ্রম এবং নিজের প্রতি বিশ্বাস মানুষকে কঠিন পরিস্থিতি থেকেও ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দিতে পারে। একসময় যিনি নিজেই সাহায্যের আশায় মানুষের দরজায় ঘুরেছিলেন, আজ তাঁর জীবনসংগ্রাম অন্যদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।

অভাব থেকে আত্মবিশ্বাস, অপমান থেকে আত্মমর্যাদা এবং অসহায়তা থেকে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার এই যাত্রাই প্রীতিলতা সরকারের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

সম্পর্কিত খবর

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *