Sunday, 25 October, 2026 | কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
Khabar 24 Bangla
এই মুহূর্তে

মেয়ে বলে অবহেলা, ৪ বার UPSC-তে ব্যর্থ! হার না মেনে IRS অফিসার কৃতিকা।

মেয়ে হওয়ায় বাবার অবহেলা, UPSC-তে পরপর ৪ বার ব্যর্থতা! সমস্ত বাধা পেরিয়ে IRS অফিসার কৃতিকা

মেয়ে হওয়ার কারণে জন্মের পর থেকেই বাবার অবহেলা! ছোটবেলায় সামাজিক অপমান, বাবার চলে যাওয়া এবং একের পর এক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই। UPSC পরীক্ষায় পরপর চারবার ব্যর্থ হয়েও হার মানেননি কৃতিকা। সমস্ত বাধা পেরিয়ে অবশেষে নিজের যোগ্যতায় অর্জন করেছেন সাফল্য। আজ তিনি একজন IRS আধিকারিক। তাঁর জীবনসংগ্রামের কাহিনি প্রমাণ করে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, দৃঢ় সংকল্প ও নিরন্তর চেষ্টা থাকলে স্বপ্নপূরণের পথ তৈরি করা সম্ভব।

কর্ণাটকের হাসানে বেড়ে ওঠা কৃতিকার শৈশব মোটেও সহজ ছিল না। তাঁর দাবি অনুযায়ী, মেয়ে হওয়ার কারণে জন্মের পর থেকেই তাঁর বাবা তাঁকে মেনে নিতে পারেননি। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলেন কৃতিকা। স্কুলে একের পর এক মেডেল ও সার্টিফিকেট অর্জন করলেও বাবার কাছ থেকে কখনও সেই সাফল্যের স্বীকৃতি বা প্রশংসা পাননি তিনি। যে বয়সে একটি শিশুর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাবা-মায়ের ভালোবাসা ও উৎসাহ, সেই সময়েই বাবার অবহেলার অভিজ্ঞতা হয়েছিল তাঁর।

পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে যখন তাঁর বাবা তাঁকে এবং তাঁর মাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর মা ও মেয়ের জীবনে শুরু হয় নতুন করে লড়াই। বাবার অনুপস্থিতির কারণে তাঁদের সামাজিক অবহেলা ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয় বলে কৃতিকা জানিয়েছেন। স্কুলে সহপাঠীদের একাংশ তাঁর পাশে বসতে চাইত না। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের একাংশের কটাক্ষও সহ্য করতে হয়েছে তাঁদের। কিন্তু এই পরিস্থিতি কৃতিকার মনোবল ভেঙে দিতে পারেনি। বরং মায়ের অপমান ও কষ্ট তাঁকে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে তোলে।

কৃতিকা উপলব্ধি করতে শুরু করেন, মানুষের কথার জবাব শুধু কথায় নয়, নিজের কাজ ও যোগ্যতার মাধ্যমেও দেওয়া যায়। তিনি মনে মনে সংকল্প করেন, একদিন এমন সাফল্য অর্জন করবেন, যাতে তাঁর মাকে আর অপমানের মুখে পড়তে না হয়। মায়ের মুখে হাসি ফোটানো এবং নিজের পরিচয় তৈরি করাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য।

কৃতিকার জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়। অঙ্কে ৯৯ নম্বর পাওয়ার পর তিনি সহপাঠীদের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝতে সাহায্য করে, নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে পারে। সেই উপলব্ধি তাঁর মনে আত্মবিশ্বাস জোগায়। ছোটবেলার সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ধীরে ধীরে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সংকল্প আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

পরবর্তী সময়ে কৃতিকার লক্ষ্য হয়ে ওঠে দেশের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা UPSC সিভিল সার্ভিস। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনিক পরিষেবায় যোগ দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেন প্রস্তুতি। কিন্তু স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় বারবার ব্যর্থতা। প্রস্তুতি নেওয়ার পরও পরপর চারবার চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা করে নিতে পারেননি তিনি। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো হাল ছেড়ে দিতেন। কিন্তু কৃতিকা ব্যর্থতাকে নিজের অযোগ্যতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখেননি।

বরং নিজের প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন তিনি। তাঁর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, প্রস্তুতির উপকরণ ও কৌশল একই রেখে নিজের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনেন। ব্যর্থতার হতাশায় ভেঙে না পড়ে নিজের লক্ষ্য স্থির রাখেন এবং চেষ্টা চালিয়ে যান। প্রতিটি ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতাই তাঁকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়।

অবশেষে আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত সাফল্য। ২০১৮ সালে UPSC সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ১৯৪তম স্থান অর্জন করেন কৃতিকা। এরপর ২০১৯ সালে আরও ভালো ফল করে ১০০তম র‌্যাঙ্ক অর্জন করেন তিনি। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, মানসিক শক্তি এবং বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা তাঁকে পৌঁছে দেয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। আজ IRS আধিকারিক হিসেবে তাঁর পরিচয় সেই দীর্ঘ সংগ্রামেরই এক গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি।

কৃতিকার এই কাহিনিতে শুধু একজন পরীক্ষার্থীর সাফল্য নেই; রয়েছে শৈশবের অবহেলা, সামাজিক অপমান এবং একের পর এক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার গল্প। তাঁর জীবন দেখায়, জীবনের শুরুটা কঠিন হলেই যে শেষটাও কঠিন হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। অন্যের অবহেলা একজন মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে না। একইভাবে, কয়েকবার ব্যর্থ হওয়া মানেই স্বপ্নের সমাপ্তি নয়।

তবে প্রতিটি মানুষের সংগ্রাম আলাদা। সাফল্যের পথও সবার জন্য এক নয়। কৃতিকার অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে পরিষ্কার থাকা, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং প্রয়োজনে নিজের মানসিকতা ও পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যে মেয়েকে একসময় অবহেলার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বলে দাবি, সেই কৃতিকার জীবন আজ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার উদাহরণ। তাঁর কাহিনি মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয় তার জন্মপরিস্থিতি কিংবা অন্যের মূল্যায়নে নির্ধারিত হয় না; নিজের চেষ্টা, যোগ্যতা এবং সিদ্ধান্তের মাধ্যমেও মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।

জীবনে ব্যর্থতা আসতে পারে, মানুষ নিরুৎসাহিত করতে পারে, পরিস্থিতিও প্রতিকূল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই কারণেই নিজের স্বপ্ন ছেড়ে দিতে হবে, এমন নয়। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখুন, ভুল থেকে শিখুন এবং লক্ষ্যপূরণের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যান। কারণ আজকের ব্যর্থতা আগামী দিনের সাফল্যের পথে একটি অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। কৃতিকার জীবনসংগ্রাম সেই আশার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

সম্পর্কিত খবর

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *