কোলে সন্তান, বাইকে খাবার ডেলিভারি! সংসারের লড়াইয়ে হার মানেননি মা, তাঁর জীবনসংগ্রাম ছুঁয়ে গেল নেটপাড়াকে
মাতৃত্বের দায়িত্ব আর সংসার চালানোর লড়াই—দুই সামলেই এগিয়ে চলেছেন এক মা।
কোলে নিজের ছোট্ট সন্তানকে আগলে রেখে বাইকে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। তাঁর এই কঠিন জীবনসংগ্রামের কাহিনি নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে একজন মা কতটা লড়াই করতে পারেন।
মা হওয়া মানে শুধু সন্তানকে ভালোবাসা নয়, তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করাও। কখনও সংসারের দায়িত্ব, কখনও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আবার কখনও সমাজের নানা বাধা—সবকিছুকে সামলে সন্তানকে ভালো রাখার চেষ্টা করেন অসংখ্য মা। তেমনই এক মায়ের জীবনসংগ্রামের কাহিনি একসময় সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। কোলে ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে বাইকে খাবার ডেলিভারি করতে বেরিয়ে পড়া এই মহিলার দৃশ্য মন ছুঁয়ে গিয়েছিল বহু মানুষের।
ঘটনাটি ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের। গুজরাটের রাজকোটের এই মহিলা অনলাইন ফুড ডেলিভারি সংস্থা জোম্যাটোর ডেলিভারি পার্টনার হিসেবে কাজ করতেন। কনটেন্ট ক্রিয়েটর বিশাল তাঁর কাজের একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেন। এরপরই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে নেটদুনিয়ায়। ভিডিওতে ধরা পড়ে এক মায়ের জীবনের কঠিন বাস্তবতা, যেখানে সন্তানের প্রতি ভালোবাসা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছাশক্তি একসঙ্গে সামনে আসে।
ভিডিওতে দেখা যায়, বাইকের সামনের দিকে বসে রয়েছে মহিলার ছোট্ট সন্তান। বাইকের পিছনে রয়েছে খাবার ডেলিভারির ব্যাগ। সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই একের পর এক অর্ডার পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যস্ত তিনি। জীবিকার তাগিদে তাঁকে প্রতিদিন কতটা পরিশ্রম করতে হয়, সেই দৃশ্য থেকেই তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়। ভিডিওটি দেখে অনেকেই তাঁর লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করেন। তাঁদের মতে, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের দায়িত্ব পালন করে যাওয়ার এই চেষ্টা নিঃসন্দেহে সম্মানের দাবি রাখে।
তবে এই জীবনসংগ্রামের পিছনে রয়েছে একাধিক বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। ওই মহিলার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি তখন এক মাসের কিছু বেশি সময় ধরে ডেলিভারির কাজ করছিলেন। পাশাপাশি তিনি হোটেল ম্যানেজমেন্টের ছাত্রীও ছিলেন। পড়াশোনা, সন্তানকে বড় করে তোলা এবং সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি নিজের উপার্জনের পথ খুঁজে নেওয়াই ছিল তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিয়ের পর সন্তানকে সামলে চাকরি খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই পথে বারবার সমস্যার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। সন্তানের দায়িত্ব রয়েছে বলে বিভিন্ন জায়গায় কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল বলে জানান ওই মহিলা। ফলে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হন তিনি। শেষ পর্যন্ত নিজের বাইক থাকায় খাবার ডেলিভারির কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন।
এই সিদ্ধান্তের মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁর আত্মনির্ভর হওয়ার ইচ্ছা। পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, অন্যের উপর নির্ভর না করে নিজের পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করার পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। কাজের ধরন সহজ ছিল না। একদিকে অর্ডার সময়মতো পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব, অন্যদিকে ছোট্ট সন্তানকে সামলে রাখা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই ছিল তাঁর কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
মহিলার বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, কোনও কাজই ছোট নয়। ইচ্ছাশক্তি এবং পরিশ্রম থাকলে মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন। তাঁর এই মনোভাব অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে যাঁরা সংসার ও সন্তানের দায়িত্বের পাশাপাশি আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁদের কাছে এই ঘটনা নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
তবে ভিডিওটি ঘিরে প্রশংসার পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে। জীবিকার তাগিদে একজন মাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হলেও, চলন্ত বাইকে ছোট্ট শিশুকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া কতটা নিরাপদ? সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অনেকেই। কারণ, রাস্তায় চলাচলের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি, যানজট এবং অন্যান্য অনিশ্চয়তা মা ও শিশু—দুজনের জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তাই একজন মায়ের লড়াইকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি তাঁর এবং সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
এই ঘটনাটি কেবল একজন ডেলিভারি কর্মীর পরিশ্রমের গল্প নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে সন্তান সামলানোর সমস্যার মতো বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নও তুলে ধরে। সন্তান রয়েছে বলে কোনও মহিলাকে যেন কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে না হয়, সেই বিষয়েও নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে। কর্মজীবী মায়েদের জন্য উপযুক্ত কাজের পরিবেশ, শিশুদের দেখাশোনার ব্যবস্থা এবং নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে অনেক মহিলার জীবনই সহজ হতে পারে।
দুর্গাপুজোর আবহে যখন আমরা দেবী দুর্গার শক্তি ও সাহসের আরাধনা করি, তখন বাস্তব জীবনের এমন মায়েদের লড়াইও আমাদের নতুন করে ভাবায়। তাঁদের হাতে হয়তো অস্ত্র নেই, নেই কোনও অলৌকিক শক্তি; রয়েছে শুধু দায়িত্ববোধ, পরিশ্রম আর সন্তানের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার অদম্য ইচ্ছা। প্রতিদিনের জীবনের কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করেই তাঁরা এগিয়ে চলেন।
রাজকোটের এই মহিলার জীবনসংগ্রামের ভিডিও তাই শুধু আবেগের গল্প নয়, এটি একদিকে আত্মনির্ভরতার বার্তা, অন্যদিকে কর্মজীবী মায়েদের বাস্তব সমস্যার প্রতিচ্ছবি। একজন মায়ের পরিশ্রমকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব, যাতে জীবিকার জন্য তাঁকে নিজের বা সন্তানের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে না হয়। কারণ, সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য একজন মা যে লড়াই করেন, সেই লড়াইয়ের পাশে দাঁড়ানোই হওয়া উচিত সমাজের প্রকৃত মানবিকতার পরিচয়।