টাকার অভাবে থেমেছিল নিজের পড়াশোনা, আজ পড়ুয়া ও বয়স্কদের বিনামূল্যে টোটো পরিষেবা দিয়ে নজির গড়ছেন সেলিম শেখ
বহরমপুর: নিজের পড়াশোনা শেষ করার স্বপ্ন পূরণ হয়নি আর্থিক অনটনের কারণে। কিন্তু সেই অপূর্ণ স্বপ্নই আজ তাঁকে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের টোটোচালক সেলিম শেখ নিজের টোটোতে বিনামূল্যে পরিষেবা দিচ্ছেন পড়ুয়া ও বয়স্ক মানুষদের। তাঁর এই মানবিক উদ্যোগ ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে নেটদুনিয়ায়।
বহরমপুর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে গাকুন্দা গ্রামের বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সি সেলিম। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর বহরমপুর কলেজে বিএ কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। ইচ্ছা ছিল পড়াশোনা শেষ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে মাঝপথেই থেমে যায় তাঁর পড়াশোনা।
ছোটবেলাতেই বাবাকে হারান সেলিম। ঠাকুমা অর্জন বিবির স্নেহে বড় হয়ে ওঠেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধী বোনকে নিয়ে সংসারের দায়িত্ব সামলাতে ঠাকুমার সংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছেন সেলিম। জীবনের সেই কঠিন অভিজ্ঞতাই তাঁকে শিখিয়েছে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় একটি সহানুভূতিশীল মন।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে নিজের টোটো কেনার পরই সেলিম সিদ্ধান্ত নেন, বয়স্ক মানুষ ও পড়ুয়াদের কাছ থেকে কোনও ভাড়া নেবেন না। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মধ্যে নিজের ঠাকুমা-দাদুর মুখ দেখতে পান তিনি। আর পড়ুয়াদের মধ্যে খুঁজে পান নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে।
সেলিমের কথায়, আর্থিক সমস্যার কারণে তাঁকে পড়াশোনা ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু অন্য কোনও পড়ুয়াকে যেন একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সেই ভাবনা থেকেই তাঁর এই উদ্যোগ। পড়ুয়ারা ভাড়া দিতে চাইলে তাঁদের টাকা না নিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করার পরামর্শ দেন তিনি। বিনিময়ে চান শুধু তাঁদের প্রার্থনা ও আশীর্বাদ।
তবে অন্যের পাশে দাঁড়ালেও নিজের সংসার চালাতে প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হয় সেলিমকে। স্ত্রী, ছোট ছেলে, প্রতিবন্ধী বোন ও ঠাকুমাকে নিয়ে তাঁর সংসার। পরিবারের এত দায়িত্ব সামলেও মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা থেকে পিছিয়ে আসেননি তিনি।
বহরমপুরে টোটো চালানোর পাশাপাশি ফেসবুকের ‘সেলিম ভাই’ পেজে নিজের কাজের ভিডিও পোস্ট করেন সেলিম। ধীরে ধীরে তাঁর এই মানবিক উদ্যোগের কথা ছড়িয়ে পড়েছে নেটদুনিয়ায়। সংবাদমাধ্যমেও উঠে এসেছে তাঁর জীবনসংগ্রাম ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাহিনি।
সেলিম শেখের এই উদ্যোগ আরও একবার মনে করিয়ে দেয়, মানবিকতার পরিচয় দিতে ধনী হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিজের স্বপ্ন পূরণ না হলেও অন্যের স্বপ্নের পথে সহযোগী হওয়া যায়। আর সেই বার্তাই নিজের কাজের মাধ্যমে প্রতিদিন তুলে ধরছেন বহরমপুরের এই টোটোচালক।