Monday, 26 October, 2026 | কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
Khabar 24 Bangla
এই মুহূর্তে

মাত্র তিন বিঘা জমি, অভাবের সংসার আর বুকভরা স্বপ্ন! ছেলেকে ডাক্তার বানাতে নিজের জমির অর্ধেক বিক্রি করে দিয়েছিলেন কৃষক বাবা। আজ NEET UG পরীক্ষায় বাংলায় তৃতীয় স্থান অর্জন করে বাবার সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা রাখলেন মুর্শিদাবাদের অনীক ঘোষ।

মাত্র তিন বিঘা জমি, অভাবের সংসার আর বুকভরা স্বপ্ন! ছেলেকে ডাক্তার বানাতে নিজের জমির অর্ধেক বিক্রি করে দিয়েছিলেন কৃষক বাবা। আজ NEET UG পরীক্ষায় বাংলায় তৃতীয় স্থান অর্জন করে বাবার সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা রাখলেন মুর্শিদাবাদের অনীক ঘোষ।

সাফল্যের পিছনে থাকে কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর পরিবারের অসংখ্য আত্মত্যাগ। আর্থিক অনটন যে স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, তা আরও একবার প্রমাণ করলেন মুর্শিদাবাদের সাগরদিঘির বয়ার গ্রামের অনীক ঘোষ। NEET UG পরীক্ষায় ৭২০ নম্বরের মধ্যে ৬৫২ নম্বর পেয়ে সর্বভারতীয় স্তরে ৬৭তম স্থান অর্জন করেছেন তিনি। রাজ্যে তাঁর স্থান তৃতীয়। অনীকের এই সাফল্যে খুশির হাওয়া পরিবার থেকে গোটা গ্রামে।

অনীকের বাবা তুষারকান্তি ঘোষ পেশায় একজন কৃষক। পরিবারের সম্বল বলতে ছিল মাত্র তিন বিঘা জমি। সেই জমিতে ধান চাষ করেই কোনওরকমে সংসার চালাতেন তিনি। সংসারে আর্থিক অনটন থাকলেও ছেলেকে চিকিৎসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখতেন বাবা-মা। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে পড়াশোনা করতে হয়েছে অনীককে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত কোনও গৃহশিক্ষকের সাহায্য ছাড়াই পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। গ্রামের পরিবেশে আধুনিক শিক্ষার সুযোগও ছিল সীমিত। তবুও নিজের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন এই মেধাবী ছাত্র।

ছেলের পড়াশোনা যাতে আর্থিক অভাবের কারণে থমকে না যায়, তার জন্য বড় ত্যাগ স্বীকার করেন তুষারকান্তি ঘোষ। অনীকের একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজের তিন বিঘা জমির অর্ধেক বিক্রি করে দেন তিনি। যে জমিতে চাষ করে সংসার চলত, সেই জমিরই একাংশ বিক্রি করে ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার ব্যবস্থা করেন কৃষক বাবা। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একদিন ছেলে নিশ্চয়ই নিজের স্বপ্ন পূরণ করবে। আজ অনীকের সাফল্যে সেই বিশ্বাসই যেন বাস্তবের রূপ পেল।

পড়াশোনায় বরাবরই মেধার পরিচয় দিয়েছেন অনীক। দশম শ্রেণির পরীক্ষায় ৯৮.২ শতাংশ এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে ৯৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর সর্বভারতীয় মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা NEET UG-তে ৭২০-এর মধ্যে ৬৫২ নম্বর পেয়ে সারা দেশে ৬৭তম স্থান অর্জন করেন। রাজ্যে তৃতীয় স্থান অধিকার করে নিজের পরিবার, শিক্ষক এবং গ্রামের মানুষের মুখ উজ্জ্বল করেছেন তিনি।

অনীকের কথায়, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে বাবা নিজের জমির অর্ধেক বিক্রি করে দিয়েছিলেন। বাবার এই আত্মত্যাগের কথা আজও ভোলেননি তিনি। ছেলের সাফল্যের পিছনে যে বাবার পরিশ্রম, ত্যাগ আর বিশ্বাসের বড় ভূমিকা রয়েছে, তা স্পষ্ট অনীকের কথাতেই। যে বাবা নিজের ভবিষ্যতের সঞ্চয় বলতে জমির একাংশ বিক্রি করে ছেলের স্বপ্নে বিনিয়োগ করেছিলেন, আজ সেই ছেলের সাফল্যই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

এবার অনীকের লক্ষ্য MBBS পড়া। সেই স্বপ্ন নিয়েই দিল্লির AIIMS-এ পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। তবে ভর্তি ও আসন পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ভর্তি প্রক্রিয়ার উপর। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, মেধা এবং পরিবারের আত্মত্যাগকে সঙ্গী করেই এবার চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চান মুর্শিদাবাদের এই কৃতী ছাত্র।

অনীকের এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষায় ভালো ফল করার গল্প নয়, এটি একজন কৃষক বাবার আত্মত্যাগ এবং ছেলের অদম্য জেদের গল্প। যে জমি ছিল পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন, সেই জমির অর্ধেক বিক্রি করেই বাবা তৈরি করেছিলেন ছেলের স্বপ্নপূরণের পথ। আজ NEET UG-তে রাজ্যে তৃতীয় স্থান অর্জন করে অনীক বুঝিয়ে দিলেন, আর্থিক প্রতিকূলতা থাকলেও ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং পরিবারের পাশে থাকার শক্তি মানুষকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। বয়ার গ্রামের এই কৃতী ছাত্রের সাফল্যে তাই গর্বিত গোটা মুর্শিদাবাদ।

সম্পর্কিত খবর

একটি মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *